পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীদের জন্য বড় সুখবর আসতে চলেছে বলে জোর জল্পনা প্রশাসনিক মহলে। অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছেন। তৃণমূল সরকার থাকাকালীন তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে কিন্তু তা পূরণ করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কম বেতন, অনিশ্চিত চাকরি এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাবে ভুগতে থাকা কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এবার বড় সিদ্ধান্তের পথে হাঁটতে পারে রাজ্য সরকার। নতুন সরকার আসার পরে অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক সমস্ত কর্মীদের জন্য আসতে চলেছে বিশাল বড় সুখবর। রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই নবান্নে একাধিক দপ্তরে শুরু হয়েছে কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ এবং শূন্যপদের বিশদ তালিকা তৈরির কাজ।

সূত্রের খবর, নতুন সরকার রাজ্যের অস্থায়ী কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে চাইছে। এর ফলে অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক সমস্ত কর্মীদের সমস্ত দাবি-দাওয়া পূরণ করা হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। বিশেষ করে পার্শ্বশিক্ষক, সিভিক ভলান্টিয়ার, ভিলেজ পুলিশ, VRP, আশা কর্মী, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর এবং বিভিন্ন দপ্তরের চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা ও বেতন কাঠামো নিয়ে ইতিমধ্যেই উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর ফলে এদের সমস্ত ডাটা সংগ্রহ করে তাদের স্থায়ীকরণের দিকে হাঁটতে চলেছে রাজ্য সরকার।
নবান্নে শুরু জোর প্রস্তুতি
প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরকে দ্রুত কর্মীদের তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই এই তথ্য জোগাড় করা শুরু হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি কোথায় কত শূন্যপদ রয়েছে, কোন দপ্তরে কত সংখ্যক অস্থায়ী কর্মী কাজ করছেন এবং কত বছর ধরে তাঁরা পরিষেবা দিচ্ছেন—সেই তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য নতুন সরকার বিশেষ নতুন কিছু আনতে পারে বলে আশাবাদী সকলেই।
বিশেষ করে ৩ জুনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ ঘিরে প্রশাসনিক মহলে জল্পনা আরও বেড়েছে। তাই ইতিমধ্যে জোর কদমে প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে এবং সমস্ত জায়গা থেকে এই অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের স্থায়ীকরণ নীতি ও বেতন কাঠামো তৈরি করা হতে পারে।
কারা পেতে পারেন সুবিধা?
সম্ভাব্যভাবে যাঁরা এই নতুন নীতির আওতায় আসতে পারেন—
- পার্শ্বশিক্ষক
- সিভিক ভলান্টিয়ার
- ভিলেজ পুলিশ
- ভিআরপি
- আশা কর্মী
- অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী
- গ্রুপ-ডি চুক্তিভিত্তিক কর্মী
- ডেটা এন্ট্রি অপারেটর
- স্বাস্থ্য ও শিক্ষা দপ্তরের অস্থায়ী কর্মচারী
- পৌরসভা ও পঞ্চায়েত স্তরের চুক্তিভিত্তিক কর্মী
তবে সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও তালিকা প্রকাশ করেনি। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সরকারি বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা করতেই হবে। ইতিমধ্যেই জানা গিয়েছে ৩ তারিখে পূর্ণাঙ্গ নোটিশ প্রকাশ করে সমস্ত তথ্য জানিয়ে দেওয়া হবে।
স্থায়ীকরণের সম্ভাবনা কতটা?
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, সরকার ধাপে ধাপে কর্মীদের স্থায়ীকরণের একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে পরিষেবা দিচ্ছেন এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। এছাড়াও সরকার বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে যেখানে কাদের কিভাবে নিয়োগ করা হয়েছে এবং কতটা বৈধ সে সম্পর্কেও তথ্য জোগাড় করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বহু বছর ধরে একই কাজ করেও অস্থায়ী অবস্থায় থাকা কর্মীদের জন্য এটি বড় স্বস্তির খবর হতে পারে। কারণ চাকরি স্থায়ী হলে শুধু মাসিক বেতনই বাড়বে না, সঙ্গে মিলবে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তাও। সমস্ত বৈধ চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য অবশেষে আসতে পারে বিশাল বড় ঘোষণা। চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা অবশেষে শেষ হতে চলেছে।
বদলাতে পারে বেতন কাঠামো
বর্তমানে বহু অস্থায়ী কর্মী দৈনিক মজুরি বা স্বল্প সম্মানিকের ভিত্তিতে কাজ করেন। নতুন সরকার সেই ব্যবস্থার পরিবর্তে নির্দিষ্ট পে-স্কেল চালুর বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানা যাচ্ছে। এর ফলে অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীরা ও সরকারি কর্মীদের মতো নির্দিষ্ট পে স্কেল এর আওতায় প্রতি মাসে মাসে একটা নির্দিষ্ট তারিখে বেতন পেয়ে যাবেন। এর পাশাপাশি তারা অবসরকালীন সময়ে পেনশন পেয়ে যাবেন এবং অবসরের সময়ে এককালীন মোটা অংকের টাকাও পেয়ে যাবেন।
যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে—
- মাসিক নির্দিষ্ট বেতন
- বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট
- ছুটির সুবিধা
- ওভারটাইম ভাতা
- নির্দিষ্ট গ্রেড পে
এর মতো একাধিক সুবিধা চালু হতে পারে।
সামাজিক সুরক্ষায় বড় জোর
শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন। সূত্রের খবর, ভবিষ্যতে কর্মীদের জন্য ইপিএফ (EPF), স্বাস্থ্যবিমা এবং অবসরকালীন আর্থিক সুবিধার বিষয়েও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর ফলে সমস্ত ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে একজন সরকারি কর্মচারী যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন এই অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীরাও এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন।
অনেক ক্ষেত্রে কর্মীরা দীর্ঘদিন পরিষেবা দিলেও কোনও পেনশন, বিমা বা সঞ্চয় সুবিধা পান না। ফলে নতুন নীতিতে এই বিষয়গুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
বিশেষ কমিটি গঠনের সম্ভাবনা
খুব শীঘ্রই এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ কমিটি গঠন করা হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। সেই কমিটি বিভিন্ন দপ্তরের রিপোর্ট খতিয়ে দেখে সুপারিশ জমা দিতে পারে। বিশেষ করে রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে যে সমস্ত চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের নিয়োগ করেছেন তাদের বৈধতা যাচাই করা হবে এবং কতটা স্বচ্ছ ভাবে নিয়োগ করা হয়েছে সে বিষয়েও যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছেন পঞ্চায়েত মন্ত্রী।
পশ্চিমবঙ্গের অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের জন্য আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। স্থায়ীকরণ, বেতন বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয় নিয়ে সরকার বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলেই জোর জল্পনা চলছে।
