পশ্চিমবঙ্গ সরকার পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এবং তাদের আরো বাড়তি নিরাপত্তা প্রদানের জন্য একের পর এক নতুন নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করেছেন, যার মধ্যে সর্বপ্রেক্ষা সর্ববহুল চর্চিত প্রকল্প হলো অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প। দীর্ঘ আলোচনা এবং বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে রাজ্যজুড়ে আবেদনগ্রহণ শুরু হতে চলেছে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ (Annapurna Bhandar Scheme) প্রকল্পের। আপনি যদি আগের লক্ষী ভান্ডার প্রকল্পের টাকা পেয়ে থাকেন তাহলেও আপনাকে নতুন করে আবার অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের জন্য আবেদন জানাতে হবে এমনটাই ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মহিলাদের প্রতি মাসে সরাসরি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে পাঠানো হবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণার পর থেকে আবেদন গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে এবং যারা খুব তাড়াতাড়ি আবেদন জানাবেন তাদের টাকাও খুব দ্রুত অ্যাকাউন্টে চলে আসবে এমনটাই জানানো হয়েছে।

বিগত সরকার লক্ষী ভান্ডার প্রকল্পে মহিলাদের ১৫০০ করে টাকা দিতেন যার ফলে তাদের হাত খরচ অনেকেরই পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবে নতুন সরকার মহিলাদের জন্য নতুন এই অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে ৩০০০ করে টাকা দেবেন যার ফলে মহিলা ভীষণভাবে উপকৃত হবেন। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলাদের জন্য এই প্রকল্প বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের গুরুত্ব
বর্তমানে দিনের পর দিন যে হারে মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে সেই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে মানুষের অল্প টাকায় জীবনধারণ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। বিগত সরকার লক্ষী ভান্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে ১৫০০ টাকা দিতে যার ফলে মহিলাদের তেমন কোন উপকার হতো না তবে নতুন এই সরকার এই পরিস্থিতিতে মাসিক ৩,০০০ টাকার আর্থিক সহায়তা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেটা বহু পরিবারের জন্য বাড়তি ভরসা হতে পারে। এই প্রকল্পের ফলে উপকৃত হবেন নিম্নবিত মধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলারা এবং এর ফলে সংসারের আয় অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে আবেদনের যোগ্যতা
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, কয়েকটি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলেই এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া যাবে। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারে আবেদন করতে হলে আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে এবং যদি কারো নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ চলে যায় বা ডিলেট হয়ে যায় তাহলে তাকে অন্নপূর্ণা ভান্ডার প্রকল্পের আওতায় তিন হাজার করে টাকা দেওয়া হবে না। এছাড়াও মহিলাদের বয়স হতে হবে অবশ্যই ২৫ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে। এর পাশাপাশি মহিলাদের ব্যাংক একাউন্টের সঙ্গে আধার লিঙ্ক থাকতে হবে এবং ব্যাংক একাউন্টে অবশ্যই DBT লিংক চালু থাকতে হবে। মহিলাদের অবশ্যই বিবাহিত হতে হবে তাহলেই এই প্রকল্পের জন্য আবেদন জানাতে পারবেন। তবে কেউ যদি সরকারি চাকরি করে বা কারো হাসবেন্ড যদি সরকারি চাকরি করে তাহলে সেই গৃহবধূ অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের জন্য আবেদন জানাতে পারবেন না।
পুরনো উপভোক্তাদের জন্য কী ঘোষণা?
যাঁরা আগে থেকেই লক্ষী ভান্ডার প্রকল্পের আওতায় রয়েছেন, তাঁদের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, পুরনো তালিকার যোগ্য উপভোক্তাদের নতুন প্রকল্পে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ফলে তাঁদের নতুন করে আবেদন করার ঝামেলায় পড়তে হবে না। তবে সরকার আরো জানিয়েছেন ইতিমধ্যেই বহু মানুষের ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ চলে গিয়েছে। এর ফলে সকলকেই আবার নতুন করে তথ্য ভেরিফাই করতে হবে এবং সমস্ত তথ্য পুনরায় যাচাই করিয়ে নিতে হবে। আর যারা এখনো আবেদন করেননি এবং এখনো এই প্রকল্পে টাকা পাননি বা যাদের আবেদন কোন ভুল ছিল তাদের আবার নতুন করে আবেদন জানাতে হবে
আবেদন পদ্ধতি
সরকার আবেদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত সহজ রাখার চেষ্টা করেছে। অনলাইন ও অফলাইন— দুইভাবেই আবেদন করা যাবে।
অনলাইনে আবেদন করার নিয়ম
অনলাইনে আবেদন করার জন্য আবেদনকারী কে সবার প্রথমেই সরকারি পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। নিচে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের লিংকটি দেওয়া হল-
West Bengal Social Security Portal
এরপর আবেদনকারীর নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে OTP ভেরিফিকেশন করতে হবে। এরপর ‘New Application’ অপশনে ক্লিক করে আবেদনপত্র খুলতে হবে। এখানে আবেদনকারীর ব্যক্তিগত সমস্ত তথ্য সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে, যেখানে আবেদনকারীর নাম, জন্মতারিখ, আধার নাম্বার, রেশন কার্ডের নাম্বার, পরিবারের তথ্য এবং ব্যাংক একাউন্টের সমস্ত তথ্য ভালোভাবে দিতে হবে। এরপর বেশকিছু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস স্ক্যান করে আপলোড করতে হবে এর মধ্যে অবশ্যই আধার কার্ড এবং ভোটার কার্ড ও ব্যাংক একাউন্ট থাকতে হবে। সবকিছু সঠিকভাবে সম্পূর্ণ হয়ে গেলে আবেদনের ফর্ম সাবমিট করে Application Reference Number সংরক্ষণ করতে হবে।
অফলাইনে আবেদন করার নিয়ম
যাঁরা অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য অফলাইন ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অফলাইনে আবেদনের জন্য আপনাকে অবশ্যই আপনার নিকটবর্তী ব্লক অফিস বা ভিডিও অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করতে হবে। এছাড়াও যারা BLO রয়েছে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করে আপনি আপনার আবেদনপত্র সাবমিট করতে পারেন। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পে ভেরিফাই করার দায়িত্ব BLO দের দেওয়া হবে বলে জানা গিয়েছে।
কোন কোন নথি লাগবে?
আবেদন করার সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি বাধ্যতামূলক।
| নথি | কেন প্রয়োজন |
|---|---|
| আধার কার্ড | পরিচয় যাচাই |
| ভোটার কার্ড | বাসস্থান প্রমাণ |
| রেশন কার্ড | পারিবারিক তথ্য |
| ব্যাঙ্ক পাসবই | DBT ট্রান্সফার |
| আয় শংসাপত্র | আর্থিক যোগ্যতা |
| মোবাইল নম্বর | OTP ও আপডেট |
| পাসপোর্ট ছবি | আবেদনপত্রের জন্য |
তবে আপনাকে টাকা পেতে হলে অবশ্যই আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে DBT লিংক থাকা বাধ্যতামূলক। অনেকের একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকে। কিন্তু সরকারি টাকা শুধুমাত্র NPCI-তে ম্যাপ করা প্রাথমিক অ্যাকাউন্টেই আসে। তাই কোন অ্যাকাউন্টটি DBT-এর জন্য সক্রিয় রয়েছে, তা আগে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
কীভাবে আধার-ব্যাঙ্ক স্ট্যাটাস চেক করবেন?
UIDAI-এর অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে খুব সহজেই আধার-ব্যাঙ্ক লিঙ্ক স্ট্যাটাস দেখা যাবে। এ ক্ষেত্রে আপনার আধার কার্ডের সঙ্গে যদি মোবাইল নাম্বার লিঙ্ক থাকে তাহলে আপনি বাড়িতে বসেই নিজে নিজে মোবাইল দিয়ে চেক করে দেখে নিতে পারবেন আপনার ব্যাংক একাউন্টের সঙ্গে আধার লিঙ্ক রয়েছে কিনা।
কবে থেকে টাকা ঢুকবে?
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, আগামী ১ জুন থেকেই DBT-এর মাধ্যমে টাকা পাঠানো শুরু হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে পুরনো উপভোক্তাদের টাকা পাঠানো হবে। নতুন আবেদনকারীদের যাচাই শেষে ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আপনার যদি সমস্ত কিছু ঠিকঠাক থেকে থাকে তাহলে একজন থেকে আপনার ব্যাংক একাউন্টে টাকা ঢুকে যাবে।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকার আর্থিক সহায়তা গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের সকল মহিলারা ভীষণভাবে উপকৃত হবেন। তাই যারা যারা এখনো আবেদন করেননি তারা অতি শীঘ্রই দেরি না করে সমস্ত তথ্য ও নথি সংগ্রহ করে দ্রুত আবেদন করুন।
